যে ছবি কাঁদিয়েছে বিশ্বকে

বিশ্বজুড়ে চলছে করোনার ভয়াল থাবা। প্রতিদিন লাখ-লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে হাজার হাজার। বর্তমানে বিশ্বময় সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন দ্রব‌্যের নাম অক্সিজেন। করোনায় আক্রান্তরা একপর্যায়ে এসে প্রকৃতি থেকে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। নির্ভর করছে কৃত্রিম শ্বাসের ওপর। সে অক্সিজেনও যে সোনার হরিণ। টাকা থাকলেও জীবনের প্রয়োজনে অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বলে, প্রিয়জন চোখের সামনে শ্বাস নিতে না পেরে চলে যাবেন? সেটা কী করে সহ্য করবেন অন্যজন! আর সে মানুষ দুজনের সম্পর্ক যদি হয় স্বামী-স্ত্রীর!

সম্প্রতি তেমনি এক ছবি দেখেছে বিশ্ব। একজন স্ত্রী তার প্রাণ প্রিয় স্বামীকে নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। পথে অটোতে শুরু হয় স্বামীর শ্বাসকষ্ট। কী করবেন পাশে বসা স্ত্রী! পাগলের মতো স্বামীর মুখে নিজের মুখ রেখে শ্বাস দিয়ে তাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে পড়েন তিনি। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও বাঁচাতে পারেন না তার স্বামীকে। ৪৭ বছর বয়সী স্বামী রবি সিংঘল অটোতেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। মুখে শ্বাস দিয়ে স্বামীকে বাঁচানোর করুণ সেই ছবিটি ভাইরাল হয় নেট দুনিয়ায়। লাখো মানুষ দেখেন স্বামীর প্রতি, একজন স্ত্রীর ভালোবাসার শেষ চেষ্টা! এর চেয়ে বড় মানবিক ছবি আর কী-ই বা হতে পারে?


খুব দূরের কোনো দেশের ঘটনা নয় এটি। আমাদের পাশের দেশ ভারতের আগ্রা শহরের ঘটনা। স্বামী-স্ত্রী রবি সিংঘল ও রেণু সিংঘল থাকেন বিকাস সেক্টর-৭-এ। করোনায় আক্রান্ত হন ৪৭ বছর বয়সী রবি সিংঘল। আক্রান্ত হওয়ার পরপরই শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তার। স্ত্রী রেণু সিংঘল স্বামীকে নিয়ে অটোতে করে রওয়ানা হন সরোজিনি নাইডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে। বাড়ি থেকে বেরুবার কিছুক্ষণের মধ্যেই অটোতে স্বামীর অবস্থার অবনতি হয়। স্ত্রী রেণু তাকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালান। একপর্যায়ে স্ত্রী রেণু স্বামীর মুখের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে বাতাস দিতে থাকেন। তাতেও বাঁচিয়ে রাখতে পারেন না স্বামীকে। অটোতেই অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্টে রবি মারা যান। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে বিশ্বময় স্বামীতে বাঁচানোর চেষ্টারত রেণুর এই ছবি ভাইরাল হয়ে যায়।

ভারতের জনগণসহ সারাবিশ্ব দেখলো, করোনায় আক্রান্ত একজন অসহায় রোগীর মৃত্যু। কোভিডে আক্রান্ত স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া রেণু সিংঘলের শেষ চেষ্টাও তার স্বামীকে রক্ষা করতে পারল না। এমনকি, স্বামীর শ্বাসকষ্ট হওয়ায় রেণু নিজে আক্রান্ত হওয়ার কথা না ভেবে স্বামীর মুখের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে তাকে শ্বাস দেওয়ার চেষ্টাও করেন। কিন্তু স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে হাসপাতালের বাইরে অটোতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবি সিংঘল। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে, ভালোবেসে স্বামীকে বাঁচানোর একজন স্ত্রীর এমন বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলো তাদের নিজ শহর আগ্রাসহ পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ!

একজন স্ত্রীর ভালোবাসা, স্বামীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা, সবকিছুকে তোয়াক্কা না করে স্বামীর চলে যাওয়া, এমন একটি মানবিক ঘটনার সাক্ষী হলাম আমি, আপনি, আমরা সবাই। এই ছবি কেবলই মনে করিয়ে দিলো, জীবনে বেঁচে থাকাটা আসলে আপনার-আমার কারও ওপরই নির্ভর করে না। জন্ম হলেই অবধারিত মৃত্যু। সৃষ্টি মানেই ধ্বংস। প্রকৃতির সৃষ্টি, প্রকৃতি তার সময়-সুযোগ মতো নিয়ে যাবেন। আমরা মানুষেরা কিছুই করতে পারবো না। কেবল চেয়ে চেয়ে দেখবো। আর মনে মনে আক্ষেপ করবো, ‘হায় জীবন এত ছোট কেনে!’

error: Content is protected !!