‘ভাত খাবার পাইনে, আবার গোস্ত’

ঈদের দিন সকালে আমিনা বেগমের ঘরে রান্না হয়েছে কচু শাক ও কাঠালের বিচি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে তবুও তার ভাগ্যে জোটেনি কোরবানির মাংস। তবে আশা ছাড়েননি তিনি। যদিও পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আমিনা বেগম উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত চর শ্যামপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী। ঈদের দিন (শনিবার) কালের কণ্ঠকে এসব কথা জানান তিনি।

দুই মেয়েসহ ৪ সদস্যর সংসার তার। স্বামী জাহাঙ্গীর আলম পেশায় দিনমজুর। মহামারী করোনাভাইরাস ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বন্যার সময় বাড়িতে বুকসমান পানি ছিল। আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী উঁচু জায়গায়। বানের পানি বাড়ি থেকে নেমে গেছে। স্বামী সন্তান নিয়ে বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরে এসেছেন। কিন্তু এরই মধ্যে চলে এসেছে কোরবানির ঈদ।

এসময় পাশে ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান কোলে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন বিউটি বেগম (৪৫)। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছেন। এক মেয়ে আর ৪ ছেলে রেখে স্বামী মারা যান। বন্যায় ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে। ঘরের মেঝেতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিভাবে বাড়ি-ঘর মেরামত করবেন এ চিন্তায় দিশেহারা।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর ত্রিশ দিনই সমান, হামার ঈদের দিন বলতে কোন কথা নাই। ভাত খাবার পাইনে, আরো গোস্ত। তিনি আরো বলেন, ছাওয়াডায় জাল দিয়ে মাছ মারি আনছে, তাহে সকালে আন্দি খাইছি। সন্ধ্যায় মাছ পাইলে খামো, না পাইলে খাওয়া হবে না।

নদী ভাঙনের শিকার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের কাজিয়ার চরের শুকজান বেগম। সব কিছু হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন চর গুজিমারী গুচ্ছগ্রামে। বন্যা শেষে হয়তো জেগে উঠা কোন নতুন চরে আশ্রয় হবে, এ আশায় দিন কাটে তার। তবে ঈদের দিন কোরবানির গোস্ত পেয়েছেন তিনি। শুকজান বেগম বলেন, বাহে মিছে কথা কবার নই, পাশের চর থাকি একজন কয়খান গোস্ত দিয়ে গেছে সেটাই খাছি।

শুধু আমিনা, বিউটি কিংবা শুকজান বেগমই না। একই অবস্থা ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা নদ বেষ্ঠিত উপজেলা প্রায় অর্ধশতাধিক চর-দীপচরের বাসিন্দাদের। দফায় দফায় বন্যা আর ভাঙনে সর্বস্বান্ত নদী পাড়ের মানুষজন। প্রতিবছর এ উপজেলায় সর্বগ্রাসী তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সহস্রাধিক ঘর-বাড়ি ও আবাদী জমি বিলীন হয়ে যায়। ঈদে চরাঞ্চলের শিশুদের ভাগ্যে জোটেনি নতুন কাপড়। মলিন কাপড়েই কেটেছে তাদের ঈদ।

হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, ঈদের পরের দিন রবিবার আল খায়ের ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থা চর গুজিমারী গুচ্ছগ্রামে ৩টি গরু কোরবানি দিয়েছে। এসব মাংস ২০০ হত-দরিদ্র পরিবারের মাঝে তা বিতরণ করা হয়েছে।

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল কাদের বলেন, এ উপজেলায় দুটি সংস্থা ১৮টি গরু কোরবানি দিয়েছে যা বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে।